স্বাভাবিক ভাবে আমরা জানি ইসলাম ধর্মে সম্পত্তিতে পুত্র সন্তান যা পায় কন্যা সন্তান তার অর্ধেক ভাগ পায়। হাঁ, কিন্তু এই নিয়ম কখন প্রযোজ্য?

 

আমাদের দেশে অনেকে ‘নারীরা মুসলিম আইনে সম্পত্তিতে পুরুষের চেয়ে কেন কম পেয়ে থাকে’ এই প্রশ্ন করে থাকেন।

কিন্তু মুসলিম আইনের সব দিক পর্যালোচনা করে দেখা যাবে, এই আইনে সম্পত্তিতে পুরুষ নয় বরং নারীরাই তুলনামূলক ভাবে বেশি সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকে।

সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই নিয়ম হল যখন তাঁরা তাঁদের বাবার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে সেই ক্ষেত্রে।

কিন্তু বাবা থেকে সম্পত্তি পাওয়া ছাড়াও পুত্র সন্তানের পাশাপাশি কন্যারা আরও বিভিন্ন ভাবে সম্পত্তি পেয়ে থাকে।

যা হিসেব করলে দেখা যাবে কন্যা সন্তানের সম্পত্তির পরিমাণ পুত্র সন্তানের সম্পত্তির চেয়ে কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি হয়।

পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১১ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “আল্লাহ তায়ালা (তোমাদের উত্তরাধিকারে) সন্তানদের সম্পর্কে (এ মর্মে) তোমাদের জন্যে বিধান জারি করছেন যে,

এক ছেলের অংশ হবে দুই কন্যা সন্তানের মতো, কিন্তু (উত্তরাধিকারী) কন্যারা যদি দু’য়ের বেশি হয় তাহলে তাদের জন্যে (থাকবে) রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ,

আর (সে) কন্যা সন্তান যদি একজন হয়, তাহলে তার (অংশ) হবে (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) অর্ধেক, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্যে থাকবে

(সে সম্পদের) ছয় ভাগের এক ভাগ, (অপর দিকে) মৃত ব্যক্তির যদি কোন সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই যদি হয় (তার একমাত্র) উত্তরাধিকারী,

তাহলে তার মায়ের (অংশ) হবে ছয় ভাগের এক ভাগ, (মৃত্যুর) আগে সে যে ওসিয়ত করে গেছে এবং তার (রেখে যাওয়া) ঋণ আদায় করে দেয়ার পরই (কিন্তু এসব ভাগ-বাটোয়ারা করতে হবে),

তোমরা জানো না তোমাদের পিতা-মাতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে কে তোমাদের জন্যে উপকারের দিক থেকে বেশী নিকটবর্তী, (অতএব) এ হচ্ছে আল্লাহর বিধান,

অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সকল কিছু সম্পর্কে ওয়াকেফহাল এবং তিনিই হচ্ছেন বিজ্ঞ, পরম কুশলী।”

 

 

প্রথমত দেনমোহরের ক্ষেত্রে নারীঃ 

একজন মুসলিম নারী বিয়ে করলে সে তাঁর স্বামী থেকে দেনমোহর পেয়ে থাকে। যা স্বামীকে অবশ্যই বিয়ের আগে-পরে মুসলিম আইন অনুযায়ী দিয়ে দিতে হয়।

আর মুসলিম বিয়েতে দেনমোহরের হার প্রায় সময় অনেক বেশি হয়ে থাকে যাতে স্বামী সহজে অকারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে না পারে।

এমন কি স্বামীর মৃত্যু হলেও স্ত্রীর প্রাপ্ত দেনমোহর মাফ হয়না। স্ত্রী তা আইন অনুযায়ী আদায় করে নিতে পারে।

 

 

দ্বিতীয়ত ভরণপোষণের ক্ষেত্রেঃ

ইসলাম ধর্মে তথা মুসলিম আইন অনুযায়ী একজন পুত্র সন্তান উপার্জনক্ষম হলে তাঁর উপর সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব এসে যায়।

আর সে যখন স্বামী তখন তাঁকে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হয়, সে যখন বাবা তখন তাঁকে তাঁর ছেলে মেয়েদের ভরণপোষণ দিতে হয় ও মেয়েদের বিয়ে ব্যবস্থা করতে হয়,

সে যখন ভাই তখন ছোট ভাই বোনদের ভরণপোষণ ও অবিবাহিত বোনদের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও থাকে তাঁর উপর।

সন্তান হিসেবে নিজ মা বাবার দায়দায়িত্বও পুত্র সন্তানকে গ্রহণ করতে হয়।

এই বিষয়ে আমাদের দেশে পিতামাতার ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা আইনও রয়েছে।

ইসলাম ধর্মে এই সকল দায়দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু মাত্র তা পুরুষের উপরই অর্পণ করা হয়েছে।

আর পুত্র সন্তানও ওই সকল দায়দায়িত্ব পালন করতে আইনগত ভাবে বাধ্য।

আর কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে উল্লিখিত দায়দায়িত্বগুলো পালন করা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার। তাই সে এই সকল দায়দায়িত্ব পালন করতে না চায়লে তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।

 

 

তৃতীয়ত উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রেঃ

একজন পুরুষ স্বাভাবিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পিতা-মাতার সম্পত্তি থেকেই অংশ পায়।

একজন নারী সন্তান হিসেবে পিতা-মাতার কাছ থেকে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর কাছ থেকে, মা হিসেবে সন্তানের কাছ থেকে সম্পত্তির অংশ পায়।

সবগুলো অংশ যোগ করলে এবং উল্লেখিত সব দিক দিয়ে বিবেচনা করলে নারীর অংশের সম্পত্তি, পিতা-মাতার কাছ থেকে পাওয়া পুরুষের অংশের সম্পত্তির চেয়ে বেশিই হওয়ার কথা।

 

মোটকথা, পুরুষ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি একটু বেশি পাওয়ার কারনে পুরুষদের সাধারণত নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে হয়ঃ

১) পরিবারের ছোট ভাই বোন থাকলে তাদের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে হয় বড় ভাইকে।

২) বাড়িতে কোন আত্নীয় (বোন, বোনের জামাই) এলে সকল খরচ বড় ভাই বহন করে থাকে।

৩) স্ত্রীর ভরণপোষণ থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় খরচ স্বামীর। কিন্তু এখানেও স্ত্রীর কোন বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নেই।

৪) বাবা মায়ের দেখাশুনা ও চিকিৎসা

৫) বোনের বিয়ের যাবতীয় খরচ ইত্যাদি।

 

তাই আগে মুসলিম আইন ও ইসলাম ধর্মে নারীদের সম্পত্তির উপর যে অধিকার দেওয়া হয়েছে

সেই অধিকারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তাবায়ন করা গেলে দেশে মুসলিম নারীদের আর্থিক কষ্ট অনেক লাঘব হয়ে যাবে।

সার্বিক দিক বিবেচনা করলে মুসলিম নারীরা পুরুষের চেয়ে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই।

কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ মুসলিম নারী আইন অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য সম্পত্তিটুকুই পায় না।

যার কারণে স্বামী মারা গেলে বা বিবাহ বিচ্ছেদ হলে তাঁদেরকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয় ।

যাহোক কারা বেশি পাচ্ছে, কারা কম পাচ্ছে এই প্রশ্নে না যেয়ে বরং আমাদের এই মুহূর্তে যেটা দরকার

তা হল মুসলিম আইনে বর্তমানে নারীদের সম্পত্তিতে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা পুরোপুরি ভাবে কার্যকর করা।

কারণ এখনও অধিকাংশ গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরেও নারীদের তাঁদের পিতৃ সম্পত্তি থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে নানা রকম ছলচাতুরী দিয়ে।

 

কখনো বা সরাসরি বলে দেওয়া হচ্ছে যে পরিবারের কোন নারী সদস্যকে কোন প্রকার সম্পত্তি দেওয়া হবে না।

তাই আমাদের আগে মুসলিম নারীর সম্পত্তিতে প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here