নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে তালিকাভুক্তি। আইনের দ্বারা নির্ধারিত তথ্যাবলি দিয়ে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সরকারিভাবে বিবাহ তালিকাভুক্তি করাই হচ্ছে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন।

মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। রেজিস্ট্রেশন করা না থাকলে মেয়েরা প্রতারিত হতে পারে। দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামা একটি আইনগত দলিল।

বিবাহ নিবন্ধনের সুফল

একটি বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করলে তার অনেক সুফল পাওয়া যায়। যেমন বিয়ের পক্ষদ্বয় বিয়ে অস্বীকার করতে পারে না এবং পরস্পর পরস্পরের প্রতি কিছু দায়দায়িত্ব পালনে বাধ্য হয়, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে বা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে বিয়ে করলে বা করার উদ্যোগ নিলে স্ত্রী আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রী দেনমোহর ও ভরণপোষণ আদায় করতে পারেন, স্বামী/স্ত্রী উভয়ে উভয়ের সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকার হতে পারেন, বিয়ের সময় দেনমোহর ধার্য না হলেও স্ত্রী ন্যায্য দেনমোহর আদায় করতে পারেন।

মুসলিম আইনে বিবাহ নিবন্ধন

মুসলিম আইন অনুযায়ী সংঘটিত বিয়ের নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক এবং না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইনটি ২০০৫ সালের ৯ নম্বর আইনের মাধ্যমে সংশোধন করে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো বিয়ে কোনো নিকাহ রেজিস্ট্রারের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় তাহলে তিনি তখনই বিবাহটি রেজিস্ট্রিকৃত করবেন। বিয়ের দিনটিতেই নিবন্ধন করা সবচেয়ে ভালো।

বিয়ের দিন নিবন্ধন সম্ভব না হলে

যদি কোনো বিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রার ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় সে ক্ষেত্রে ওই বিয়ের বর বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারকে বিয়েসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানাবেন। নিকাহ রেজিস্ট্রার ওই বিয়ে সম্পর্কিত রিপোর্ট জানার সঙ্গে সঙ্গে বিয়েটি নিবন্ধন করবেন।

বিয়ে নিবন্ধন না করার সাজা

যদি কেউ এ আইনের নির্দেশ অমান্য করেন তাহলে তিনি এ আইনের অধীনে অপরাধ করেছেন বলে বিবেচিত হবেন এবং এ অপরাধের জন্য আইন কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি হচ্ছে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদ- অথবা আর্থিক জরিমানা যা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে অথবা উভয় ধরনের শাস্তিই হতে পারে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারকার্য পরিচালনা করবেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। যদি কেউ এ আইন অমান্য করেন তাহলে ভুক্তভোগী একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
বিশেষত নারীরা বিয়ে রেজিস্ট্রশন না করাজনিত সমস্যার সম্মুখীন হন বিধায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে জানানো উচিত। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন কপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিবাহ নিবন্ধন সংক্রান্ত কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে নারীরা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে পারেন। সাধারণত যে এলাকায় বিয়ে সংঘটিত হয়েছে সেখানেই বিয়েটি নিবন্ধন করানো ভালো।

হিন্দু আইনে বিবাহ নিবন্ধন

২০১২ সালের আগে হিন্দু পারিবারিক আইন অনুযায়ী হিন্দু বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কোনো বিধান ছিল না। তবে ২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনের মধ্য দিয়ে হিন্দু বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের বিধান চালু হয়েছে। এ আইনের আওতায় কেবল হিন্দু বিয়ে নিবন্ধিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। হিন্দু বিয়ে নিবন্ধনের জন্য হিন্দু রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

খ্রিস্টান আইনে বিবাহ নিবন্ধন

১৮৭২ সালের খ্রিস্টান ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্টানদের বিয়ে সম্পাদিত হয়। খ্রিস্টান বিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং একটি পবিত্র চুক্তি। খ্রিস্টান বিয়ে লিখিত মাধ্যমে সম্পাদিত হয় এবং নিবন্ধন বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয়। খ্রিস্টান বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হলে বিয়ের পাত্র-পাত্রীর পুরো নাম ও ডাক নাম এবং পেশা বা অবস্থা, পাত্র-পাত্রীর আবাসস্থল ও বাসস্থানের ঠিকানা, পাত্র-পাত্রী কত দিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন তার প্রমাণপত্র, বিয়ে সম্পাদনের চার্চ বা অন্য কোনো স্থান ইত্যাদি তথ্য যুক্ত করে বর-কনে বিয়ের একটি নোটিশ চার্চে জমা দেবেন। নোটিশপ্রাপ্তির পর চার্চের ধর্মযাজক নোটিশটি খোলা জায়গায় লাগিয়ে দেবেন, যাতে এটি সবার নজরে আসে। এভাবে নোটিশ কয়েক সপ্তাহ ঝোলানো থাকবে যাতে কারো কোনো আপত্তি থাকলে তিনি আপত্তি করতে পারেন। যদি কোনো আপত্তি না পান তাহলে চার্চপ্রধান বিয়ের পক্ষগণের কাছ থেকে একটি ঘোষণা গ্রহণ করবেন। এ ঘোষণাটি বিয়ের পক্ষগণ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়ে দেবেন যাতে থাকবেথ_ বিয়ের পাত্র-পাত্রীর মধ্যে জানামতে এমন কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক নেই যাতে তাদের বিয়েতে আইনসম্মত বাধা আছে এবং বিবাহের পাত্র-পাত্রী দুজনেই আইন অনুযায়ী সাবালক। এ ঘোষণা সম্পন্ন হওয়ার কমপক্ষে চার দিন পর চার্চের ধর্মযাজক বিয়ের আবেদনকারীকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। সার্টিফিকেট জারির দুই মাসের মধ্যে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

নিবন্ধনের সময় কাজী যেসব বিষয় দেখবেন

বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের সময় বিয়ের কাজীর কতগুলো বিষয় সাবধানতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হয়।
যেমন_ বরের বয়স কমপক্ষে ২১ এবং কনের কমপক্ষে ১৮ বছর হয়েছে কিনা, বর ও কনের বিয়েতে পূর্ণ সম্মতি আছে কিনা, বিয়ের প্রকৃত সাক্ষী রয়েছে কিনা এবং বিয়েতে আশু ও বিলম্বিত দেনমোহর কত নির্ধারিত হয়েছে? বিয়েতে উলি্লখিত শর্তগুলো পূরণ হলেই কেবল কাজী (নিকাহ রেজিস্ট্রার) বিয়ে নিবন্ধন করবেন। তবে তিনি কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের (তালাক-ই-তৌফিজের) ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল করবেন।

বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করতে কত ফি দিতে হয়?

মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে একজন বিয়ে রেজিস্ট্রার দেনমোহরের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করে থাকেন। ধার্যকৃত দেনমোহরের চার লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি হাজারে ১২.৫০ টাকা (প্রতি হাজারের অংশবিশেষের জন্যও ১২.৫০ টাকা) এবং চার লাখ টাকার উপরে প্রতি লাখে ১০০ টাকা (প্রতি লাখের অংশবিশেষের জন্যও ১০০ টাকা) হারে নিবন্ধন ফি প্রদান করতে হয়। আগে নিবন্ধন ফির সর্বোচ্চ হার চার হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও বর্তমানে তা আর প্রযোজ্য নয়। উল্লেখ্য, রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধের দায়িত্ব বর পক্ষের। সরকার সময়ে সময়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ ফি পরিবর্তন ও ধার্য করে থাকে। রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিলে নিকাহ রেজিস্ট্রার একটি প্রাপ্তি রশিদ প্রদান করবেন। এখানে উল্লেখ্য, মুসলিম বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের পর নিকাহ রেজিস্ট্রার বাধ্যতামূলকভাবে বর ও কনে পক্ষকে বিয়ের কাবিননামার সত্যায়িত কপি প্রদান করবেন। খ্রিস্টান বিয়ের সত্যায়িত কপির জন্য যথাযথ ফি দিয়ে সত্যায়িত কপি নিতে হবে।

রেজিস্ট্রেশন না থাকলে কি বিয়ে প্রমাণ করা যায় না?

রেজিস্ট্রেশন না থাকলেও বিয়ে প্রমাণ করা যেতে পারে। বিয়ের ছবি এবং বর-কনে কিংবা তাদের প্রতিবেশীদের সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে আদালতে বিয়ে প্রমাণ করা যেতে পারে। তবে রেজিস্ট্রেশন করাটা বিয়ের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী ও উত্তম দলিল। –

তথ্যঃ বাংলাদেশের আইন ও আদালত ফেসবুক পেইজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here