বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেন-মোহর। এই শর্তটি পূরণ ব্যতীত কোন বিবাহ বৈধ হতে পারে না।দেনমোহরের সংজ্ঞা দিতে ডি.এফ মোল্লা বলেন, মোহর বা মোহরানা হলো কিছু টাকা বা অন্য কিছু সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পাবার অধিকারী। মোহরানা স্ত্রীর সন্মানের প্রতীক।

 

সুতরাং বিয়ের আসরে বা অনুষ্ঠানে স্বামী তার স্ত্রীকে মর্যাদা স্বরুপ যে অর্থ বা সম্পদ দেয় বা দেবার অঙ্গীকার করে তাকে দেনমোহর বলে।

 

দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার এবং এটা স্বামীর কাছে স্ত্রীর প্রাপ্যঃ বিয়েতে যদি দেনমোহর নির্ধারণ করা না হয়, তবে স্ত্রী তার মর্যাদা ও যোগ্যতার বিচারে দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী।

 

এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতি বা যুক্তি কিংবা আইন নেই, স্ত্রী তার স্বামীর নিকট নিজেকে সমর্পণ করলে বা মৌখিকভাবে স্বামী কর্তৃক মাফ চাওয়ার পর মাফ শব্দটি উচ্চারণ করলে আশু দেনমোহরের দাবি নিঃশেষ হয়ে যায়।

দেনমোহর স্বামীর ঋণ, যা স্বামী তাঁর স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য। মাহমুদা খাতুন বনাম আবু সাইদ (২১ ডি.এল.আর) মামলায় মহামান্য বিচারপতি কর্তৃক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে,

‘সহবাসের আগে এবং পরে স্ত্রী স্বামীর কাছে তলবী মোহরানার দাবি করতে পারে এবং স্বামী তলবী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী তার স্বামীর অধিকারে অর্থাৎ সহবাসে যেতে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারেন।’

এ অজুহাতে স্বামী স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করলে তা পরিশোধে বাধ্য।

(১১ ডি এল আর (ডবলু পি) লাহোর ১২৪। স্বামী এহেন মোহরানা পরিশোধ ব্যতীত দাম্পত্য অধিকারের ডিক্রি পেতে পারে না। যে কোন বিষয় সম্পত্তি মোহরানার জন্য ধার্য করা যায় না।

ইহা হতে পারে নগদ অর্থ, কোন বীমা পলিসি বা অন্য কোন দ্রব্য সামগ্রী। তবে কোন হারাম বস্তু হতে পারবে না। স্বামীর দখলে নেই এমন কোন সম্পত্তি পারে না। ভবিষ্যত কোন বিষয়ও এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না।

 

দেনমোহর নির্ধারণ পদ্ধতি

মোহরানার পরিমান সুনির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেয়া হয়নি। তাই তা আপেক্ষিক। অর্থাৎ বর ও কণের উভয়ের দিক বিবেচনান্তে তা নির্ধারিত হয়।

দেনমোহর কত হবে তা নির্ণয়কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে যেমন স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফুদের ক্ষেত্রে দেনমোহরের পরিমাণ কত ছিল তা বিবেচনা করা হয়।

তাছাড়া স্ত্রীর পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

অপর দিকে বরের আর্থিক ক্ষমতার দিকটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এসব দিক বিচার বিবেচনা করেই মূলতঃ দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়।

১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের ১০ ধারা মোতাবেক দেনমোহর প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রী চাহিবামাত্র সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলেও এর কোন সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ নেই।

তবে দেনমোহরের পরিমাণ বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করার সময়ে বা বিয়ের আসরে নির্ধারণ করতে হবে।

তবে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হল বিয়ের দিন নির্ধারণ করার পূর্বে উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে ধার্য্য করা।

বর নিজেই এ চুক্তি করতে পারে। এই দেনমোহর দাম্পত্য মিলন, তালাক-বিচ্ছেদ অথবা স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর দ্বারা নিশ্চিত হয়।

দেনমোহরের অংশ

দেনমোহরের দুটো অংশ যথাক্রমে (১) মুয়াজ্জল (আশু) দেনমোহর (২) মু-অজ্জল (বিলম্বিত) দেনমোহর।

ক) মুয়াজ্জল বা আশু দেনমোহর হচ্ছে, নগদে স্ত্রীকে প্রদান করা অর্থাৎ বিয়ের আসরে দিতে হয়। বিয়ের আসরে না দিতে পারলে পারিবারিক জীবন চলাকালীন সময়ে দেনমোহরের যে অংশটুকু স্ত্রী চাহিবামাত্র স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে।

খ) মু-অজ্জল বা বিলম্বিত দেনমোহর হচ্ছে, দেনমোহরের যে অংশটুকু স্বামীর মৃত্যুর পর কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাকের পর স্ত্রী পেয়ে থাকে।

 

জামিনদারঃ

যদি কোন ব্যক্তি একজনের স্বামীর স্ত্রীর মোহরানার দায়িত্ব নেয় তবে সে উহা পরিশোধের জন্য দায়ী হবে।

বিবাহ উত্তর দেনমোহরের জন্য জামিনদার থাকলে সেক্ষেত্রেও জামিনদার দায়ী হবে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

যদি স্বামীর উত্তরাধিকারীরা স্বামীর সম্পত্তি থেকে দেনমোহর দিতে অস্বীকার করেন তাহলে স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, যদি স্বামীর আগে স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধিত না হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা ঐ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী।

ফলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা দেনমোহর পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করতে পারবেন।

 

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনঃ

এই আইনের ধারা ১০ এ মোহরানা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বিবাহের কাবিননামায় কি ধরণের দেনমোহর স্ত্রীর পাওনা হবে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা না থাকলে দেনমোহরের সমুদয় অর্থ স্ত্রী চাহিবামাত্রই পরিশোধযোগ্য।

যদি সালিশী পরিষদের আদেশ বলে ইহা কার্যকরী হলে স্ত্রীর তা পাওনা হয়ে যায়। উহা পরিশোধ না করলে ১ মাস কারাদন্ড বা ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে।

 

স্ত্রী কর্তৃক মোহরানা মওকুফঃ

স্ত্রী ইচ্ছা করলে তার স্বামী বা স্বামীর উত্তরাধিকারীগণের পক্ষে আংশিক বা সম্পূর্ণ দেনমোহর মওকুফ করে দিতে পারে। হতে পারে তা প্রতিদান ব্যতিরেকে।

এহেন হ্রাস বা মওকুফ অবশ্যই স্ত্রীর পূর্ণ সন্মতিতে হতে হবে। স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুতে ভারাক্রান্ত হয়ে উহা মওকুফ বা হ্রাস করলে তা তার জন্য বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে।

নাবালক স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ অবৈধ। ভালবাসা বা স্নেহ ইত্যাদি পাবার আশায় স্ত্রী যদি দেন-মোহর পরিত্যাগ করে তবে তার জন্য উহা বাধ্যতামূলক নয়।

তবে মোহরানা যাই থাকুক না কেন স্বামী নিজ উদ্যোগে মোহরানা বৃদ্ধি করতে পারে।

 

দেনমোহরের মামলা ও তামাদি আইন

ক) স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা না পেলে সে এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীগন এর জন্য মামলা দায়ের করতে পারে।

খ) আশু দেনমোহর স্ত্রী চাহিবা মাত্র স্বামী দিতে বাধ্য। স্বামী দিতে অস্বীকার করলে বা না দিলে সেদিন থেকে তিন বৎসরের মধ্যে স্ত্রীকে মামলা দায়ের করতে হবে।

বিলম্বিত দেনমোহর আদায়ের সময়সীমা হল মৃত্যু অথবা তালাকের ফলে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটলে ওই তারিখ হতে তিন বৎসরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। তা না হলে মামলা তামাদি হয়ে যাবে।

স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর স্ত্রী যেই আদালতের এলাকায় বসবাস করেন ওই আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। এর জন্য মাত্র পঁচিশ টাকা কোর্ট ফি দিতে হয়।

মোজাহেদুল ইসলাম বনাম রওশন আরা (২২ ডি.এল.আর, পৃষ্ঠা-৬৭৭) মামলায় বলা হয়েছে, দেনমোহর কখনই মাফ হয় না। স্বামী যদি মারাও যায় তবে সে স্বামীর সম্পদ হতে দেনমোহর আদায় করা যায়।

অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর যদি স্ত্রী সমুদয় অথবা শুধুমাত্র বিলম্বিত দেনমোহরের অর্থ অনাদায়ী থেকে থাকে।

তবে স্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর ভূ-সম্পত্তি দখল করত উহার রাজস্ব বা মুনাফা হতে তা উসুল করতে পারে। কেননা ইসলামী আইনে দেনমোহরকে দেনা বলে বিবেচনা করা হয়।

দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশি হোক না কেন, পক্ষগুলোর মধ্যে স্বীকৃত হলে স্বামী তা সম্পূর্ণ রূপে স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। এমনকি স্বামীর আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও আদালত দেনমোহরানার দায় হতে স্বামীকে মুক্তি দেবে না।

আরেকটি কেস ষ্টাডিতে দেখা যায়, রুমী নামের একটি মেয়ের বিয়ের দুই দিনের মাথায় স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যায়।

দেনমোহরের মামলায় কাবিননামায় যে পরিমাণ অর্থ উল্লেখ ছিল সে পরিমাণ অর্থ স্ত্রী দাবি করে ওই স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে।

ওই মামলায় স্বামী অর্থাৎ মামলায় যিনি বিবাদীপক্ষ তিনি দাবি তোলেন যে, কাবিননামায় উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ ঠিক নয়।

বিবাদী পক্ষ উক্ত মামলার জবাবে দম্পতির সহবাস সংগঠনের আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবী করে সাকুল্য মোহরানার অর্ধেক পরিশোধ করতে রাজী হয়।

এক্ষেত্রে যদি স্বামী সমুদয় অংশ প্রদান করেন তবে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু সহবাস যদি হয়ে থাকে, তবে স্বামী সমুদয় মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে বলে রাখা উচিত সহবাস হয়েছিল কিনা তা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় বাদীপক্ষের অর্থাৎ স্ত্রীর।

অর্থাৎ স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরানা পাবে। যদি স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বেই মারা যায় তাহলে স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানা পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here