যদি কেউ আইনের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অনুরাগ থেকে নেশার মত শুধু আইন সাধনা করতে থাকেন এবং অধিক কাজের ফলশ্রুতিতে মৃত্যুমুখে পতিত হন তাহলে আপনি তাকে কি বলবেন?

 

যদি কেউ যৌবনে আইন ও ক্যারিয়ারের নেশায় মাতাল হয়ে নিজ-সংসার তুচ্ছ জ্ঞান করেন এবং ফলশ্রুতিতে অতি সুন্দরী ও ললনাময়ী স্ত্রী ও যদি তাকে ত্যাগ করেন তাহলে ওই আইনী আশেককে আপনি কি নামে ডাকবেন?

আপনি তাকে যেভাবেই মূল্যায়ন করেন না কেন আমার চোখে সে আইনের মস্ত বড় সাধক।

হ্যাঁ, আজকের আলোচ্য উক্ত সাধকের নাম ব্যারিস্টার Sir Edward Marshall Hall KC।

বৃটিশ ভারতের পটভূমিতে রচিত ক্যালকাটা হাইকোর্ট তথা আদালত পাড়া কেন্দ্রিক উকিল-ব্যারিষ্টারদের দৈনন্দিন জীবন-আচার ভিত্তিক চিত্র উল্লেখে ‘শংকর’ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস ‘কত অজানারে’র মাধ্যমে

সর্বপ্রথম Sir Edward Marshall Hall KC এর নাম ও সুনাম সম্পর্কে প্রথম অবগত হবার সুযোগ লাভ করি।

প্রচন্ড আগ্রহ থেকে পরবর্তীতে তাঁর সম্পর্কে ইন্টারনেট ও পুস্তকে জানার চেষ্টা করি। তারই ফলশ্রুতি আজকের আইন সাধকদের জীবনী পর্বে ব্যারিস্টার এডওয়ার্ড মার্শাল হলের জীবনী শ্রদ্ধাভরে আলোচনা।

Sir Edward Marshall Hall KC,

জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৮ Brighton, England. এবং মৃত্যু২৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯২৭. তিনি ছিলেন একজন ইংলিশ ব্যরিষ্টার।

সমসাময়িককালে লোকজন তাকে সবচেয়ে’ বেশি যে নামে চিনতেন তা হল তিনি ছিলেন ফৌজদারী মামলার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসামী পক্ষের কৌশলী।

 

তাঁর অসাধারণ বাচন ভঙ্গি ও জবানবন্দী ও জেরা করার ক্ষমতা তাকে তাঁর পেশার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।

ইতিহাসে আলোচিত অনেক কুখ্যাত খুনের মামলা থেকে নিরপরাধ আসামীদের ছাড়িয়ে আনার সুখ্যাতি তাকে “The Great Defender” নামে পরিচিত করেছিল।

মার্শাল হল ভিক্টোরিয়ান যুগ ও তার এডওয়ার্ডীয়ান যুগে ব্যরিষ্টার হিসাবে ইংল্যান্ডের আদালত সমূহ কাপিয়ে বেড়িয়েছেন।

 

তখনকার সময় বড় বড় ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা ব্যাপকভাবে জন আগ্রহে পরিণত হয়েছিল । সেগুলো দৈনন্দিন ভিত্তিতে জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোতে প্রচার হত।

তখনকার সময়ে আলোচিত আইনজীবীদের মধ্যে তাঁর বাচনভঙ্গিগত, আইনী যুক্তি ও জেরা-জবানবন্দীর কৌশল অন্য অনেক আইনজীবীদের তুলনায় অধিক আকর্ষনীয় ও উপভোগ্য ছিল।

তার সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে ,বলা হয় যখন তিনি চাঞ্চল্যকর ফৌজদারী মামলাগুলোর শুনানি করতেন তখন আদালতের ভেতর বাইরে জনতার ঢল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত।

 

Sir Edward Marshall Hall KC এর ব্যক্তিগত জীবনঃ

১৮৮২ সালের তিনি Ethel Moon নামীয় একজন মহিলাকে তিনি বিয়ে করেন যদিও তাঁর উক্ত বিবাহ সুখকর হয় নি।

তারা প্রায়শই আলাদা থাকতেন এবং ১৮৮৯ সালে চূড়ান্তভাবে তারা আইনী পন্থায় আলাদা হয়ে যান।

১৯৯০ সালে মুন তাঁর বয়ফ্রেন্ড কর্তৃক গর্ভবতী হন এবং পরবর্তীতে ভুল এ্যাবোরশনের ফলে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন

যদিও এই কারণে এথেল মুনের বয়ফ্রেন্ড, এবর্শনিষ্ট ও অন্য কতিপয়কে হত্যার দায়ে আইনের মুখোমুখি হতে হয়।

বলা হয় এথেল মুনের মৃত্যুও ব্যারিস্টার মার্শালের আইন ক্যারিয়ার গঠনে ভূমিকা রাখে

কেননা তিনি এথেলের প্রতি উদাসীনতার অনুশোচনা বোধ থেকে পুরুষ কর্তৃক নিষ্ঠুর আচরণের স্বীকার অনেক মহিলার পাশে দাড়িয়েছেন।

যাই হোক, তিনি পরবর্তী জীবনে হেনেরিটা নামে অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করেন এবং সেখানে তাঁর এলনা নামে এক কন্যা সন্তান ছিল।

তিনি অত্যন্ত্য কাজ পাগল একজন আইনজীবী ছিলেন। ক্লায়েন্টের প্রতিটি মামলাকে তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়ে সেগুলো নিয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, গবেষণা, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস ইত্যাদি কাজে নিমগ্ন থাকতেন।

প্রতিটি মামলার প্রতি তাঁর এইরুপ গুরুত্ব আরোপ অন্য আইনজীবী থেকে জয় ছিনিয়ে আনতে তাকে সাহায্য করেছিল।

অতিরিক্ত কাজের ফলে নিজের প্রতি তিনি খেয়াল রাখতে উদাসীনতা প্রদর্শণন করেন

এবং বলা হয় নিজের প্রতি এরুপ উদাসীনতা তাকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত করে যা তাকে ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যু মুখে তুলে দেয়।

 

Camden Town Murder case
Sir Edward Marshall Hall KC এর জীবনে তাকে “The Great Defender” নামে সুখ্যাতি আনতে যে কয়েকটি মামলা টনিকের মত কাজ করেছিল তাঁর মধ্যে একটি ছিল Camden Town Murder Case.

 

১৯০৭ সালে Sir Edward Marshall Hall KC এর কাছে এই মামলার ব্রিফ আসে।

এই মামলায় মার্শাল এমন এক আসামীকে বাচিয়েছিলেন যাকে ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে খুনের দায়ে আদালতে তাঁর সর্বোচ্চ সাজা হতে যাচ্ছে।

 

কারণ ঘটনার আগে পরে তাঁর ভূমিকা, টি,আই প্যারেডে তাঁর সনাক্ত করণ, আসামী নিজ কর্তৃক এক্সট্রা জুডিশিয়াল স্বীকারোক্তি,

পারিপার্শ্বিক স্বাক্ষ্য ইত্যাদি বিবেচনায় প্রাইমা ফেসি সবাই ঊডকে দোষী সাব্যস্ত্য করবে- এটাই ছিল স্বাভাবিক।

 

মামলার সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, এমিলি ডিমোক ওরফে ফিলিস নামিয় এক পতিতার গলাকাটা মৃতদেহ তাঁর ঘরে পাওয়া যায়।

ঘরে এমন এক পোষ্ট কার্ড ও পাওয়া যায় যার হাতের লেখা ছিল আসামী রবার্ট উডের। পোষ্ট কার্ডে ঘটনার রাতে আসামী ভিক্টিমকে তাঁর সঙ্গে মেলামেশা করার জন্য বলেন।

 

শুধু তাই নয় ঘটনার পর আসামীর গার্লফ্রেন্ড রুবি ইয়ংকে (যিনিও একজন পতিতা ছিলেন) আসামী অনুরোধ করেন যে,

যদি কেউ আসামী উডের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে তাহলে যেন রুবি সেই জিজ্ঞাসাকারীকে এটা বলে দেয় যে, ঘটনার সময় আসামী উড রুবির সাথে ছিল।

 

উল্লেখ্য, টি, আই প্যারেডে অন্য স্বাক্ষীগন আসামীকে সনাক্ত করেন, অন্য সাক্ষী তাঁর সাক্ষে আদালতে বললেন যে, ঘটনার রাতে আসামিকে উক্ত ঘটনা স্থলের নিকটে দেখা গেছে।

কেউবা আবার বলেন যে, আসামির সহিত মৃত ভিক্টিমকে স্থানীয় ব্রোথেলে দেখা গেছে।

 

অন্য দিকে যদিও পোষ্ট কার্ডে প্রেরকের ঠিকানায় ‘এলিস’ নামে একজনের নাম লেখা ছিল কিন্তু হাতের লেখা যে রবার্ট উডের এটা প্রমাণ হয়েছিল।

 

সুতরাং সব বিবেচনায় আসামী রবার্টই যে উক্ত এমিলি ডিমোকের হত্যার জন্য দায়ী এটা প্রতীয়মান হচ্ছিল যদিও খুনের মোটিভ সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত হয় নি।

 

ডোয়ার্ড মার্শালের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জিং ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা ছিল

কেননা ১৯০৭ সালের আগে তখনকার সময় তাঁর আইন পেশায় খুব মন্দাভাব ছিল। ভাল কোন ব্রিফ তাঁর হাতে ছিল না।

 

সুতরাং এই মামলায় মার্শাল তাঁর অসাধারণ ভাষা শৈলির ব্যাবহার সর্বোপরি অবিশ্বাস্য জেরার মাধ্যমে আসামী রবার্ট উডকে নিশ্চিত শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন।

 

Green Bicycle Murder কেস

Sir Edward Marshall Hall KC অন্যতম আরেকটি মামলা হচ্ছে R v Ligh যাকে Green Bicycle Murder মামলাও বলা হয়।

এই মামলাটিও পূর্বে উল্লেখিত Camden Town Murder মামলার ন্যায় পারিপার্শ্বিক স্বাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল যা ছিল পুরোপুরি আসামির বিরুদ্ধে।

 

এই মামলায়ও আসামীর বিরুদ্ধে যে সকল সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপণ করা হয়

তা হল আসামী রোনাল্ড লাইট যাকে দেখা ঘটনার দিন ভিক্টিম মৃত বেলা রিটকে গ্রীণ সাইকেলে চড়িয়ে ঘুরতে দেখা গিয়েছল।

আসামির দখলে এমন এক অস্ত্র(রিভলবার) ছিল যেটি সদৃশ্য কোন অস্ত্র দ্বারা ভিকটিমকে হত্যা করা হয়েছিল।

বলা হয় আসামী কাজ শেষ হবার পর উক্ত গ্রীন বাইসাকেল খালের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। এছাড়া গ্রেফতার হবার পর আসামী পুলিশের নিকট মিথ্যা বলেছিলেন।

 

Sir Edward Marshall Hall KC হল এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উথাপিত

সাক্ষ্য প্রমানের অকাট্যতা প্রমানের ব্যার্থতাসমূহ তুলে ধরা সহ জেরার মাধ্যমে সাক্ষীদের বিশ্বাস যোগ্যতাতাকে খন্ডন করেন।

এছাড়া কিছু ল’ পয়েন্টে ব্যারিস্টার মার্শাল হল এমন সব যুক্তি তুলে ধরেন যার মাধ্যমে জুরিরা আসামীকে খালাস দিতে বাধ্য হন।

 

ল’ পয়েন্ট গুলোর মধ্যে একটি হল খুনের জন্য পূর্বপরিকল্পনার বিষয়টি অন্যতম।

কিন্তু এই মামলায় ‘হেয়ার সে’ (বাংলাদেশে ডাইং দেক্লারেশনের অনুরুপ) নিয়মের উপর ভিত্তি করে

এবং ভিক্টিমের প্রদত্ত জবান বন্দীর উপর নির্ভর করে ব্যারিস্টার হল এটা প্রমাণ করেন যে, খুনের সাথে আসামীর কোন যোগ সূত্রতা নেই।

 

সফলতার পাশাপাশি তিনি কতিপয় মামলায় ব্যার্থ্যও হয়েছেন। ১৯১২ সালে বিখ্যাত পয়জনিং মামলায় তিনি আসামী ফ্রেডারিক সেডনকে রক্ষা করতে ব্যার্থ হন

যদিও বলা হয় সেডনের ফাঁসির জন্য সেডন নিজেও দায়ি কারণ সে আইনজীবীর পরামর্শ পুরোপুরি মানেন নি।

 

এছাড়া তিনি জীবনে অসংখ্য ফৌজদারী মামলা পরিচালনা করেন এবং অনেককে তীক্ষ্ণ আইনী যুক্তি, কেস স্টাডি ইত্যাদির মাধ্যমে অনেককে রক্ষা করেন।

 

জীবনে তিনি সংসদে জন প্রতিনিধি হিসাবেও যাবার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাঁর জীবনী বিবিসি’তে ৮ পর্বের ধারাবাহিকে প্রচারিত হয়েছে।

 

এছাড়া তাঁর বিভিন্ন বিখ্যাত মামলা গুলোও টেলিভিশনে উপস্থাপিত ও প্রচারিত হয়েছে।

পরিশ্রম করলে, আইনকে ভালবাসলে যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে স্থান করে নেয়া যায় – ব্যারিস্টার মার্শাল হলের জীবনী থেকে এটাই হোক আমাদের শিক্ষা।

 

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here