কালকের মধ্যে রায়ের অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বাদ না দিলে অপসারণে আন্দোলন-ব্যারিস্টার তাপস

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এজলাসে বসে প্রধানমন্ত্রীকে চোখ রাঙানির মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তানের মতো প্রধানমন্ত্রীকে নাকি তিনি পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।

এজলাসে বসে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান বিচারপতির এই রকম হুমকি দেওয়া নজিরবিহীন। এটা শপথ ভঙ্গের শামিল।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ আগষ্টের মধ্যে এই রায়ের অপ্রসাঙ্গিক, অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক বক্তব্য প্রত্যাহারসহ সম্পূর্ণ রায় বাতিল করে প্রধান বিচারপতি অচিরেই পদত্যাগ করবেন। অন্যত্থায় আগামী অক্টোবর থেকে এক দফার মাধ্যমে তাকে অপসারণে আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে আমরা বাধ্য হব। গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচীতে ব্যারিস্টার তাপস এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে প্রধান বিচারপতি যে অপ্রাসঙ্গিক, অসাংবিধানিক মন্তব্য করেছেন, এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি  আাামাদের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি সংসদকে হেয় করেছেন। তিনি মহিলা সংসদ সদস্যের বিষয়ে কটূক্তি করে নারীদের হেয় করেছেন। তাদের হেয় করে গোটা নারী সমাজকে হেয় করেছেন। সর্বোপরি তিনি তার রায়ে উল্লেখ করেছেন তিনি নাকি কারও সার্ভেন্ট না। তিনি প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা না। তিনি  নিজেই মাস্টার। আমরা এর নিন্দা জানাই।
সংগঠনের আহবায়ক অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়, এটা মনে রাখতে হবে। কাজেই ওই সব কথা বলে পার পাবেন না।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, নুরুল ইসলাম সুজন এমপি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী, সানজিদা খানম এমপি, আজহার উল্লাহ ভুইয়া, রবিউল আলম বুদু প্রমুখ।
তথ্য ও ছবি- ইত্তেফাক/আনিসুর

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়- এখন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি যা পারেন

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে রিভিউয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে রায়ের অনুলিপি চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এরইমধ্যে আইনমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর একটি প্রশ্নও দেখা দিয়েছে, তাহলো– রাষ্ট্রপতি কী পারেন।

 

সেই প্রশ্ন সামনে রেখেই রায় পর্যালোচনার পাশাপাশি ৯৭ অনুচ্ছেদ নিয়েও চলছে আলোচনা। আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি যদি সংকট মনে করেন, তাহলে তিনি সংবিধানের ৯৭ ধারা ব্যবহার করতে পারেন।

 

সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,

‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচাপতি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় দখল না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকদের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’

গত ১৩ আগস্ট রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন,

এখানে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে কোনও একক ব্যক্তির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি– কথাটি আছে। মন্ত্রীর মতে, ‘এই মামলায় এটা অপ্রাসঙ্গিক এবং ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফাইনালি এটা ইতিহাস বিকৃত করার সমান।’

গত ৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সংবিধানের এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উত্থাপিত হলে তাকে অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দেওয়া হয়েছিল।

তবে ওই সংশোধনী বাতিলের ফলে সেই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরে আসে। এই কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি।

গত ১ আগস্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হওয়ার পর এর পর্যবেক্ষণ অংশ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মনে করেন জনগণ ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রত্যাখান করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছি। এখন নিশ্চয়ই সমাধান করবেন তিনি।’

সংবিধান বিশ্লেষক তুরিন আফরোজ বলেন,

‘রাষ্ট্রপতিকে সব বিষয়ে অবহিত করতেই পারেন। যদি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে সেটাও অবহিত করতে পারেন। যদি হস্তক্ষেপ করতে চান– উনি সংকট মনে করেন কিনা সেটাই বিষয়। যদি সংকট মনে করেন, তাহলে করতে পারেন। এগুলো সবই পরিস্থিতি সাপেক্ষে ‘যদি’র ওপর নির্ভরশীল।’

সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ ব্যবহারের ক্ষমতা ও যৌক্তিকতা রাষ্ট্রপতির আছে উল্লেখ করে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন,

‘সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দিতে পারেন। একটা শক্তিশালী অভিযোগ উঠেছে উনি (প্রধান বিচারপতি) শপথ ভঙ্গ করেছেন। এটির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। উনি যেসব কথা রায়ে উল্লেখ করেছেন, এর নব্বই ভাগ সম্পৃক্ততাহীন। এটিকে আমি ফরমায়েশি রায় বলছি। মামলার বিষয়বস্তুর চেয়ে সেগুলো যোজন যোজন দূরে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অপসারণ করতে পারেন, বিচারপতি পদ থেকে নয়।’ একজন সাবেক বিচারপতির বিষয়ে যেন দুর্নীতির তদন্ত না হয় সেটা বলেও প্রধান বিচারপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন উল্লেখ করে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘একাধিকবার শপথ ভঙ্গ করার কারণে তাকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার কথাও বলা যেতে পারে।তবে ৯৭ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে তাকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে আছে।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

দেনমোহর সংক্রান্ত আইন, আদালত ও প্রতিকার – এডভোকেট গোলাম কিবরীয়া

বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেন-মোহর। এই শর্তটি পূরণ ব্যতীত কোন বিবাহ বৈধ হতে পারে না।দেনমোহরের সংজ্ঞা দিতে ডি.এফ মোল্লা বলেন, মোহর বা মোহরানা হলো কিছু টাকা বা অন্য কিছু সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পাবার অধিকারী। মোহরানা স্ত্রীর সন্মানের প্রতীক।

 

সুতরাং বিয়ের আসরে বা অনুষ্ঠানে স্বামী তার স্ত্রীকে মর্যাদা স্বরুপ যে অর্থ বা সম্পদ দেয় বা দেবার অঙ্গীকার করে তাকে দেনমোহর বলে।

 

দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার এবং এটা স্বামীর কাছে স্ত্রীর প্রাপ্যঃ বিয়েতে যদি দেনমোহর নির্ধারণ করা না হয়, তবে স্ত্রী তার মর্যাদা ও যোগ্যতার বিচারে দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী।

 

এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতি বা যুক্তি কিংবা আইন নেই, স্ত্রী তার স্বামীর নিকট নিজেকে সমর্পণ করলে বা মৌখিকভাবে স্বামী কর্তৃক মাফ চাওয়ার পর মাফ শব্দটি উচ্চারণ করলে আশু দেনমোহরের দাবি নিঃশেষ হয়ে যায়।

দেনমোহর স্বামীর ঋণ, যা স্বামী তাঁর স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য। মাহমুদা খাতুন বনাম আবু সাইদ (২১ ডি.এল.আর) মামলায় মহামান্য বিচারপতি কর্তৃক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে,

‘সহবাসের আগে এবং পরে স্ত্রী স্বামীর কাছে তলবী মোহরানার দাবি করতে পারে এবং স্বামী তলবী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী তার স্বামীর অধিকারে অর্থাৎ সহবাসে যেতে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারেন।’

এ অজুহাতে স্বামী স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করলে তা পরিশোধে বাধ্য।

(১১ ডি এল আর (ডবলু পি) লাহোর ১২৪। স্বামী এহেন মোহরানা পরিশোধ ব্যতীত দাম্পত্য অধিকারের ডিক্রি পেতে পারে না। যে কোন বিষয় সম্পত্তি মোহরানার জন্য ধার্য করা যায় না।

ইহা হতে পারে নগদ অর্থ, কোন বীমা পলিসি বা অন্য কোন দ্রব্য সামগ্রী। তবে কোন হারাম বস্তু হতে পারবে না। স্বামীর দখলে নেই এমন কোন সম্পত্তি পারে না। ভবিষ্যত কোন বিষয়ও এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না।

 

দেনমোহর নির্ধারণ পদ্ধতি

মোহরানার পরিমান সুনির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেয়া হয়নি। তাই তা আপেক্ষিক। অর্থাৎ বর ও কণের উভয়ের দিক বিবেচনান্তে তা নির্ধারিত হয়।

দেনমোহর কত হবে তা নির্ণয়কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে যেমন স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফুদের ক্ষেত্রে দেনমোহরের পরিমাণ কত ছিল তা বিবেচনা করা হয়।

তাছাড়া স্ত্রীর পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

অপর দিকে বরের আর্থিক ক্ষমতার দিকটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এসব দিক বিচার বিবেচনা করেই মূলতঃ দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়।

১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের ১০ ধারা মোতাবেক দেনমোহর প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রী চাহিবামাত্র সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলেও এর কোন সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ নেই।

তবে দেনমোহরের পরিমাণ বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করার সময়ে বা বিয়ের আসরে নির্ধারণ করতে হবে।

তবে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হল বিয়ের দিন নির্ধারণ করার পূর্বে উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে ধার্য্য করা।

বর নিজেই এ চুক্তি করতে পারে। এই দেনমোহর দাম্পত্য মিলন, তালাক-বিচ্ছেদ অথবা স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর দ্বারা নিশ্চিত হয়।

দেনমোহরের অংশ

দেনমোহরের দুটো অংশ যথাক্রমে (১) মুয়াজ্জল (আশু) দেনমোহর (২) মু-অজ্জল (বিলম্বিত) দেনমোহর।

ক) মুয়াজ্জল বা আশু দেনমোহর হচ্ছে, নগদে স্ত্রীকে প্রদান করা অর্থাৎ বিয়ের আসরে দিতে হয়। বিয়ের আসরে না দিতে পারলে পারিবারিক জীবন চলাকালীন সময়ে দেনমোহরের যে অংশটুকু স্ত্রী চাহিবামাত্র স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে।

খ) মু-অজ্জল বা বিলম্বিত দেনমোহর হচ্ছে, দেনমোহরের যে অংশটুকু স্বামীর মৃত্যুর পর কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাকের পর স্ত্রী পেয়ে থাকে।

 

জামিনদারঃ

যদি কোন ব্যক্তি একজনের স্বামীর স্ত্রীর মোহরানার দায়িত্ব নেয় তবে সে উহা পরিশোধের জন্য দায়ী হবে।

বিবাহ উত্তর দেনমোহরের জন্য জামিনদার থাকলে সেক্ষেত্রেও জামিনদার দায়ী হবে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

যদি স্বামীর উত্তরাধিকারীরা স্বামীর সম্পত্তি থেকে দেনমোহর দিতে অস্বীকার করেন তাহলে স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, যদি স্বামীর আগে স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধিত না হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা ঐ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী।

ফলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা দেনমোহর পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করতে পারবেন।

 

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনঃ

এই আইনের ধারা ১০ এ মোহরানা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বিবাহের কাবিননামায় কি ধরণের দেনমোহর স্ত্রীর পাওনা হবে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা না থাকলে দেনমোহরের সমুদয় অর্থ স্ত্রী চাহিবামাত্রই পরিশোধযোগ্য।

যদি সালিশী পরিষদের আদেশ বলে ইহা কার্যকরী হলে স্ত্রীর তা পাওনা হয়ে যায়। উহা পরিশোধ না করলে ১ মাস কারাদন্ড বা ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে।

 

স্ত্রী কর্তৃক মোহরানা মওকুফঃ

স্ত্রী ইচ্ছা করলে তার স্বামী বা স্বামীর উত্তরাধিকারীগণের পক্ষে আংশিক বা সম্পূর্ণ দেনমোহর মওকুফ করে দিতে পারে। হতে পারে তা প্রতিদান ব্যতিরেকে।

এহেন হ্রাস বা মওকুফ অবশ্যই স্ত্রীর পূর্ণ সন্মতিতে হতে হবে। স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুতে ভারাক্রান্ত হয়ে উহা মওকুফ বা হ্রাস করলে তা তার জন্য বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে।

নাবালক স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ অবৈধ। ভালবাসা বা স্নেহ ইত্যাদি পাবার আশায় স্ত্রী যদি দেন-মোহর পরিত্যাগ করে তবে তার জন্য উহা বাধ্যতামূলক নয়।

তবে মোহরানা যাই থাকুক না কেন স্বামী নিজ উদ্যোগে মোহরানা বৃদ্ধি করতে পারে।

 

দেনমোহরের মামলা ও তামাদি আইন

ক) স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা না পেলে সে এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীগন এর জন্য মামলা দায়ের করতে পারে।

খ) আশু দেনমোহর স্ত্রী চাহিবা মাত্র স্বামী দিতে বাধ্য। স্বামী দিতে অস্বীকার করলে বা না দিলে সেদিন থেকে তিন বৎসরের মধ্যে স্ত্রীকে মামলা দায়ের করতে হবে।

বিলম্বিত দেনমোহর আদায়ের সময়সীমা হল মৃত্যু অথবা তালাকের ফলে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটলে ওই তারিখ হতে তিন বৎসরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। তা না হলে মামলা তামাদি হয়ে যাবে।

স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর স্ত্রী যেই আদালতের এলাকায় বসবাস করেন ওই আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। এর জন্য মাত্র পঁচিশ টাকা কোর্ট ফি দিতে হয়।

মোজাহেদুল ইসলাম বনাম রওশন আরা (২২ ডি.এল.আর, পৃষ্ঠা-৬৭৭) মামলায় বলা হয়েছে, দেনমোহর কখনই মাফ হয় না। স্বামী যদি মারাও যায় তবে সে স্বামীর সম্পদ হতে দেনমোহর আদায় করা যায়।

অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর যদি স্ত্রী সমুদয় অথবা শুধুমাত্র বিলম্বিত দেনমোহরের অর্থ অনাদায়ী থেকে থাকে।

তবে স্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর ভূ-সম্পত্তি দখল করত উহার রাজস্ব বা মুনাফা হতে তা উসুল করতে পারে। কেননা ইসলামী আইনে দেনমোহরকে দেনা বলে বিবেচনা করা হয়।

দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশি হোক না কেন, পক্ষগুলোর মধ্যে স্বীকৃত হলে স্বামী তা সম্পূর্ণ রূপে স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। এমনকি স্বামীর আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও আদালত দেনমোহরানার দায় হতে স্বামীকে মুক্তি দেবে না।

আরেকটি কেস ষ্টাডিতে দেখা যায়, রুমী নামের একটি মেয়ের বিয়ের দুই দিনের মাথায় স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যায়।

দেনমোহরের মামলায় কাবিননামায় যে পরিমাণ অর্থ উল্লেখ ছিল সে পরিমাণ অর্থ স্ত্রী দাবি করে ওই স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে।

ওই মামলায় স্বামী অর্থাৎ মামলায় যিনি বিবাদীপক্ষ তিনি দাবি তোলেন যে, কাবিননামায় উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ ঠিক নয়।

বিবাদী পক্ষ উক্ত মামলার জবাবে দম্পতির সহবাস সংগঠনের আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবী করে সাকুল্য মোহরানার অর্ধেক পরিশোধ করতে রাজী হয়।

এক্ষেত্রে যদি স্বামী সমুদয় অংশ প্রদান করেন তবে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু সহবাস যদি হয়ে থাকে, তবে স্বামী সমুদয় মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে বলে রাখা উচিত সহবাস হয়েছিল কিনা তা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় বাদীপক্ষের অর্থাৎ স্ত্রীর।

অর্থাৎ স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরানা পাবে। যদি স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বেই মারা যায় তাহলে স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানা পাবে।

বিবাহ নিবন্ধন আইনের টুকিটাকি ও বিভিন্ন ধর্মে বিবাহ নিবন্ধন পদ্ধতি

নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে তালিকাভুক্তি। আইনের দ্বারা নির্ধারিত তথ্যাবলি দিয়ে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সরকারিভাবে বিবাহ তালিকাভুক্তি করাই হচ্ছে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন।

মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। রেজিস্ট্রেশন করা না থাকলে মেয়েরা প্রতারিত হতে পারে। দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামা একটি আইনগত দলিল।

বিবাহ নিবন্ধনের সুফল

একটি বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করলে তার অনেক সুফল পাওয়া যায়। যেমন বিয়ের পক্ষদ্বয় বিয়ে অস্বীকার করতে পারে না এবং পরস্পর পরস্পরের প্রতি কিছু দায়দায়িত্ব পালনে বাধ্য হয়, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে বা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে বিয়ে করলে বা করার উদ্যোগ নিলে স্ত্রী আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রী দেনমোহর ও ভরণপোষণ আদায় করতে পারেন, স্বামী/স্ত্রী উভয়ে উভয়ের সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকার হতে পারেন, বিয়ের সময় দেনমোহর ধার্য না হলেও স্ত্রী ন্যায্য দেনমোহর আদায় করতে পারেন।

মুসলিম আইনে বিবাহ নিবন্ধন

মুসলিম আইন অনুযায়ী সংঘটিত বিয়ের নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক এবং না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইনটি ২০০৫ সালের ৯ নম্বর আইনের মাধ্যমে সংশোধন করে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো বিয়ে কোনো নিকাহ রেজিস্ট্রারের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় তাহলে তিনি তখনই বিবাহটি রেজিস্ট্রিকৃত করবেন। বিয়ের দিনটিতেই নিবন্ধন করা সবচেয়ে ভালো।

বিয়ের দিন নিবন্ধন সম্ভব না হলে

যদি কোনো বিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রার ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় সে ক্ষেত্রে ওই বিয়ের বর বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারকে বিয়েসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানাবেন। নিকাহ রেজিস্ট্রার ওই বিয়ে সম্পর্কিত রিপোর্ট জানার সঙ্গে সঙ্গে বিয়েটি নিবন্ধন করবেন।

বিয়ে নিবন্ধন না করার সাজা

যদি কেউ এ আইনের নির্দেশ অমান্য করেন তাহলে তিনি এ আইনের অধীনে অপরাধ করেছেন বলে বিবেচিত হবেন এবং এ অপরাধের জন্য আইন কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি হচ্ছে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদ- অথবা আর্থিক জরিমানা যা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে অথবা উভয় ধরনের শাস্তিই হতে পারে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারকার্য পরিচালনা করবেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। যদি কেউ এ আইন অমান্য করেন তাহলে ভুক্তভোগী একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
বিশেষত নারীরা বিয়ে রেজিস্ট্রশন না করাজনিত সমস্যার সম্মুখীন হন বিধায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে জানানো উচিত। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন কপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিবাহ নিবন্ধন সংক্রান্ত কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে নারীরা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে পারেন। সাধারণত যে এলাকায় বিয়ে সংঘটিত হয়েছে সেখানেই বিয়েটি নিবন্ধন করানো ভালো।

হিন্দু আইনে বিবাহ নিবন্ধন

২০১২ সালের আগে হিন্দু পারিবারিক আইন অনুযায়ী হিন্দু বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কোনো বিধান ছিল না। তবে ২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনের মধ্য দিয়ে হিন্দু বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের বিধান চালু হয়েছে। এ আইনের আওতায় কেবল হিন্দু বিয়ে নিবন্ধিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। হিন্দু বিয়ে নিবন্ধনের জন্য হিন্দু রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

খ্রিস্টান আইনে বিবাহ নিবন্ধন

১৮৭২ সালের খ্রিস্টান ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্টানদের বিয়ে সম্পাদিত হয়। খ্রিস্টান বিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং একটি পবিত্র চুক্তি। খ্রিস্টান বিয়ে লিখিত মাধ্যমে সম্পাদিত হয় এবং নিবন্ধন বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয়। খ্রিস্টান বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হলে বিয়ের পাত্র-পাত্রীর পুরো নাম ও ডাক নাম এবং পেশা বা অবস্থা, পাত্র-পাত্রীর আবাসস্থল ও বাসস্থানের ঠিকানা, পাত্র-পাত্রী কত দিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন তার প্রমাণপত্র, বিয়ে সম্পাদনের চার্চ বা অন্য কোনো স্থান ইত্যাদি তথ্য যুক্ত করে বর-কনে বিয়ের একটি নোটিশ চার্চে জমা দেবেন। নোটিশপ্রাপ্তির পর চার্চের ধর্মযাজক নোটিশটি খোলা জায়গায় লাগিয়ে দেবেন, যাতে এটি সবার নজরে আসে। এভাবে নোটিশ কয়েক সপ্তাহ ঝোলানো থাকবে যাতে কারো কোনো আপত্তি থাকলে তিনি আপত্তি করতে পারেন। যদি কোনো আপত্তি না পান তাহলে চার্চপ্রধান বিয়ের পক্ষগণের কাছ থেকে একটি ঘোষণা গ্রহণ করবেন। এ ঘোষণাটি বিয়ের পক্ষগণ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়ে দেবেন যাতে থাকবেথ_ বিয়ের পাত্র-পাত্রীর মধ্যে জানামতে এমন কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক নেই যাতে তাদের বিয়েতে আইনসম্মত বাধা আছে এবং বিবাহের পাত্র-পাত্রী দুজনেই আইন অনুযায়ী সাবালক। এ ঘোষণা সম্পন্ন হওয়ার কমপক্ষে চার দিন পর চার্চের ধর্মযাজক বিয়ের আবেদনকারীকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। সার্টিফিকেট জারির দুই মাসের মধ্যে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

নিবন্ধনের সময় কাজী যেসব বিষয় দেখবেন

বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের সময় বিয়ের কাজীর কতগুলো বিষয় সাবধানতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হয়।
যেমন_ বরের বয়স কমপক্ষে ২১ এবং কনের কমপক্ষে ১৮ বছর হয়েছে কিনা, বর ও কনের বিয়েতে পূর্ণ সম্মতি আছে কিনা, বিয়ের প্রকৃত সাক্ষী রয়েছে কিনা এবং বিয়েতে আশু ও বিলম্বিত দেনমোহর কত নির্ধারিত হয়েছে? বিয়েতে উলি্লখিত শর্তগুলো পূরণ হলেই কেবল কাজী (নিকাহ রেজিস্ট্রার) বিয়ে নিবন্ধন করবেন। তবে তিনি কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের (তালাক-ই-তৌফিজের) ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল করবেন।

বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করতে কত ফি দিতে হয়?

মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে একজন বিয়ে রেজিস্ট্রার দেনমোহরের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করে থাকেন। ধার্যকৃত দেনমোহরের চার লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি হাজারে ১২.৫০ টাকা (প্রতি হাজারের অংশবিশেষের জন্যও ১২.৫০ টাকা) এবং চার লাখ টাকার উপরে প্রতি লাখে ১০০ টাকা (প্রতি লাখের অংশবিশেষের জন্যও ১০০ টাকা) হারে নিবন্ধন ফি প্রদান করতে হয়। আগে নিবন্ধন ফির সর্বোচ্চ হার চার হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও বর্তমানে তা আর প্রযোজ্য নয়। উল্লেখ্য, রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধের দায়িত্ব বর পক্ষের। সরকার সময়ে সময়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ ফি পরিবর্তন ও ধার্য করে থাকে। রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিলে নিকাহ রেজিস্ট্রার একটি প্রাপ্তি রশিদ প্রদান করবেন। এখানে উল্লেখ্য, মুসলিম বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের পর নিকাহ রেজিস্ট্রার বাধ্যতামূলকভাবে বর ও কনে পক্ষকে বিয়ের কাবিননামার সত্যায়িত কপি প্রদান করবেন। খ্রিস্টান বিয়ের সত্যায়িত কপির জন্য যথাযথ ফি দিয়ে সত্যায়িত কপি নিতে হবে।

রেজিস্ট্রেশন না থাকলে কি বিয়ে প্রমাণ করা যায় না?

রেজিস্ট্রেশন না থাকলেও বিয়ে প্রমাণ করা যেতে পারে। বিয়ের ছবি এবং বর-কনে কিংবা তাদের প্রতিবেশীদের সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে আদালতে বিয়ে প্রমাণ করা যেতে পারে। তবে রেজিস্ট্রেশন করাটা বিয়ের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী ও উত্তম দলিল। –

তথ্যঃ বাংলাদেশের আইন ও আদালত ফেসবুক পেইজ

ক্ষতিপূরণের মামলা করে REMEDY বা প্রতিকার পাবেন কিভাবে?

0

রামপুর গ্রামের আবু দাউদ, আবু বকরের কাছে ৩০০০ কেজি রুই মাছ বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু দাউদ আবু বকরের মাছ বিক্রি করেনি।

নির্ধারিত সময়ে মাছ সরবরাহ না করার জন্য তার ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আবু দাউদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

আবু বকর বায়নার টাকা উদ্ধার এবং দাউদ এ জন্য ৩০০০০ টাকা বায়না হিসেবে গ্রহণ করেছে।

ক্ষতিপূরণের মামলা ঘটনার ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে দায়ের করতে হয়। অবশেষে আদালত আবু দাউদকে বায়নার টাকা ফেরত দেয়াসহ ক্ষতিপূরণের আদেশ দেন।

কোন পক্ষের মধ্যে কোন কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে চুক্তি হয়। চুক্তি লিখিত বা মৌখিক হতে পারে। চুক্তি পালন করা সব মানুষের কর্তব্য কিন্তু দুনিয়ার সব মানুষ এক না।

সবাই চুক্তি পালন করে চলে না। এজন্য কোর্ট কাচারির দরকার হয়। চুক্তি পালন না করলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে চুক্তি পালনে বাধ্য করা যায়।

আদালত চুক্তি পালনে বাধ্য করে। এমন ঘটনাও ঘটে যে সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার জন্য চুক্তি পালন করে পক্ষের কোন উপকার হয় না।

ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তাহলে উপায় কি? উপায় নিশ্চয়ই আছে!

ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুষিয়ে দেয়া হয়। এমন ঘটনাও হয় যখন চুক্তি পালনতো করতেই হয় তার উপর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

যে চুক্তি শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুষিয়ে দেয়া যায় সেখানে

বা যখন চুক্তি পালন করে কোন লাভ হবে না তখন ক্ষতিপূরণের মামলা করা হয়। বায়না প্রবলের মামলা একটি চুক্তি পালনের মামলা।

এমন অনেক ঘটনা আছে যেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিকার করা যায় না।

আবার অনেক ঘটনা আছে আংশিক পালন ও আংশিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রতিকার করা যায়।

রহিম করিমের কাছে ৫ বিঘা জমি বিক্রির জন্য বায়না করল। পরে দেখা গেল রহিম ৪ বিঘা জমির মালিক, বাকি এক বিঘা জমির মালিক তার ভাই কালাম।

এখন দেওয়ানি আদালতে মামলা করলে ৫ বিঘা জমি করিমকে রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য রায় দিতে পারে না।

এই ক্ষেত্রে ৪ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য রায় দিতে পারে।

বাকি এক বিঘা জমির ব্যাপারে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দিতে পারে।

যেখানে চুক্তি প্রবল করার সুযোগ আছে সেখানে কেউ ইচ্ছা করলে চুক্তি প্রবলের মামলা করতে পারে।

আবার শুধু ক্ষতিপূরণ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার জন্য ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে। তবে চুক্তি প্রবলের মামলা খারিজ হলে আর ক্ষতিপূরণের মামলা করা যায় না।
সুত্রঃ অনলাইন

বিয়ে নিয়ে দন্ডবিধি আইনের টুকিটাকি

বাংলাদেশে বিয়ের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন নেই ফলে বিভিন্ন রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় নারীদের। তাই বর্তমান বাস্তবতায় প্রত্যেক ধর্মের নিজন্ব পারিবারিক আইন মতে বিবাহ ও বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন সম্পাদিত হয়।

মুসলিম আইন মতে বিয়ে হচ্ছে ধর্ম কর্তৃক অনুমোদিত একটি দেওয়ানি চুক্তি।

বাংলাদেশে প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৮ ধারা পর্যন্ত বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান করা হয়েছে । সেগুলো জেনে নিন।

প্রতারনার মাধ্যমে বিয়েতে ১০ বছর কারাদন্ড :

৪৯৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলক আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস সৃষ্টি করায়, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে যদি আইনসম্মতভাবে না হয়ে থাকে এবং ওই নারীর সঙ্গে যৌন- সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

স্বামী বা স্ত্রী থাকা স্বত্বেও বিয়ে করলে ৭ বছর কারাদন্ড:

৪৯৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করে, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

যে ক্ষেত্রে এ ধারার অধীন শাস্তি হবে না:

 তবে যে সাবেক স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বিয়ের সময় পর্যন্ত সে স্বামী বা স্ত্রী যদি সাত বছর পর্যন্ত নিখোঁজ থাকেন এবং সেই ব্যক্তি বেঁচে আছেন বলে কোনো সংবাদ না পান, তাহলে এ ধারার আওতায় তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে গণ্য হবেন না।

দ্বিতীয় বিয়ে করলে ও পূর্বের বিয়ে গোপন রাখলে শাস্তি ১০ বছর:

৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা পূর্ববর্তী বিয়ের তথ্য গোপন রাখে, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারে, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে।

আইনসম্মত বিয়ে না হলে ৭ বছর জেল:

 ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে সম্পন্ন করে, তাহলে অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। 

স্বামীর অজ্ঞাতে মিলামেশা করলে:

৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো নারীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি ব্যতীত যৌনসঙ্গম করে এবং অনুরূপ যৌনসঙ্গম যদি ধর্ষণের অপরাধ না হয়,

তাহলে সে ব্যক্তি ব্যভিচারের দায়ে দায়ী হবে, যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডসহ উভয় দণ্ড।

এ ক্ষেত্রে নির্যাতিতাকে অন্য লোকের স্ত্রী হতে হবে। তবে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকের কোনো শাস্তির বিধান আইনে নেই।

ফুসলিয়ে কোন মহিলাকে নিয়ে গেলে :

৪৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিবাহিত নারীকে ফুসলিয়ে বা প্ররোচনার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া এবং তাকে অপরাধজনক উদ্দেশ্যে আটক রাখা অপরাধ। এ ধারা অনুযায়ী অপরাধী ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডসহ উভয় ধরনের শাস্তি পাবে

আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে আইন জানা কতটা জরুরী

আইন না জানা কি অপরাধ? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হ্যাঁ, আইন না জানা অপরাধ। অনেকে আবার মজা করে বলতে পারেন- তবে কি আইনজীবী বা আইনের লোকেরা ছাড়া বাকী সবাই অপরাধী?

দেশের আইন জানা ও মানা একজন সুনাগরিকের অন্যতম কর্তব্য। তবে আইন না জানা অপরাধ কিনা, এই প্রশ্নের উত্তর অতটা সহজ না।?

বিস্তারিত আলোচনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের প্রস্তাবনার চতুর্থ অংশে বলা হয়েছে-

“একে রক্ষার, সমর্থনের এবং নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব দেশের জনগণকে অর্পণ করা হয়েছে।”

এখন অনেকে বলতে পারেন-তবে কি আইনজীবী বা আইনের লোকেরা ছাড়া অন্য সবাই অপরাধী?

 

আমাদের আইন জানার প্রয়োজন কতটা এখানে নিহিত রয়েছে। আইন যদি নাই জানি তবে আইনের নিরাপত্তা বিধান কিভাবে হবে?

এছাড়া আইনের একটি ম্যাক্সিম আছে, “ইগনোরেন্সিয়া জুরি নন এক্সকিউজা” অর্থাত অপরাধ করে আদালতের কাছে যদি বলেন,

এটা অপরাধ সেটা আপনি জানতেন না! এ কথা বলে বা আইনের অজ্ঞতার কারণ দেখিয়ে আপনি কৃত অপরাধের শাস্তি থেকে কোনভাবেই ছাড় পাবেন না।

অর্থাৎ রাষ্ট্র ধরে নেয় যে, সংশ্লিষ্ট আইনটি সম্পর্কে নাগরিকরা জানেন। এজন্যই আমাদের দৈনন্দিন সাধারণ আইন গুলো জানা উচিত।

 

আমাদের আইন জানার প্রয়োজন কতটা এখানে নিহিত রয়েছে। আইন যদি নাই জানি তবে আইনের নিরাপত্তা বিধান কিভাবে হবে?

আপনি অপরাধ করছেন কিন্তু আপনি যদি আদালতের কাছে বলেন, এটা অপরাধ সেটা আপনি জানতেন না!

 

এ কথা বলে বা আইনের অজ্ঞতার কারণ দেখিয়ে আপনি কৃত অপরাধের শাস্তি থেকে কোনভাবেই ছাড় পাবেন না।

অর্থাৎ রাষ্ট্র ধরে নেয় যে, সংশ্লিষ্ট আইনটি(যে ধরণের অপরাধ সেই আইন) সম্পর্কে নাগরিকরা জানেন।

 

বাস্তবে যদিও মানুষ আইন সচেতন না এবং আইন সম্পর্কে খুব একটা ধারণা রাখেন না ।

সাধারণত আইন কোন কাজটি অপরাধ আর কোন কাজটি অপরাধ নয় তা খুঁজে বের করে এবং কৃত অপরাধমূলক কাজটির জন্য শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে।

 

অর্থাৎ আইন তৈরীর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা এবং অপরাধ থেকে দূরে রাখা। সমাজে যাতে অপরাধমূলক কর্মকান্ড কম হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

 

দৈনন্দিন জীবনে আইনের প্রয়োজনীয়তা:

কিন্তু অপরাধ করে কেউ অজ্ঞতার দোহাই দিয়ে পার পাবেনা। এজন্যই আমাদের দৈনন্দিন সাধারণ আইনগুলো জানা উচিত।

শুধু তাই নয়- আইনের অজ্ঞতার কারণে সাধারণ মানুষই বেশি বিপদে পড়ে, নির্যাতিত ও প্রতারিত হয়, সমাজের প্রভাবশালীদের দ্বারা অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

 

সুতরাং প্রত্যেকটা মানুষকে আইন বিষয়ে সচেতন হতে হবে। জানতে হবে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে- কি তাঁর জন্য আইন, কি তাঁর অধিকার!

আইন জানলে প্রয়োজনে শাসককেও চ্যালেঞ্জ করা যায়।

 

উদাহরণ হিসেবে রিট-এর কথা বলা যায়। (দেখুন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪ এবং ১০২ ।)

অন্যের প্রয়োজনে না, নিজের প্রয়োজনে নিজেকে আইন জানতে হবে। আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

 

কারো কাছ থেকে কোন অধিকার প্রাপ্ত হলে, আগে জানতে হবে অধিকার আদায়ের বৈধ পন্থা, বিধি-নিষেদ।

যুগের সাথে-সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যেকোন নাগরীকের জন্য আইন জানা তাই অত্যাবশ্যক

সড়ক দুর্ঘটনায় আইন ও দুর্ঘটনার পেছনের কারণ এবং কিছু কথা

0

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে রোজ যত লোক প্রাণ হারান বা জখম হন, সেই পরিসংখ্যান শিউড়ে ওঠার মতো।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর হিসেবে

গত দশ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন।

এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৫৪৮ জন।

 

সড়ক দুর্ঘটনার হারে বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও তাদের সাজার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় তলানিতে।

কঠোর আইনের অভাব, বিদ্যমান আইনের ব্যবহার না হওয়াসহ নানা কারণকে এ জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। গেল মাসে অনুমোদন পেয়েছে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭।

প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড রাখা হয়েছে। যা আগেই বলবৎ ছিল।

 

১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু মতিঝিলের আনন্দ ভবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন।

১৯৯১ সালে তার স্ত্রী রওশন আরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

২৫ বছর পর ২০১৪ সালের ২০ জুলাই সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে রায় দেন আপিল বিভাগ।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাউকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে রায় ঘোষণা দেশে এটিই প্রথম বলে জানান আইনজীবীরা।

 

দুর্ঘটনার কারণকে তিন ভাগে দেখানো যেতে পারে

১)বিধি-বিধান ও পরিচালনার দুর্বলতা :

এর মধ্যে আছে ট্রাফিক আইনের যথার্থ প্রয়োগ না হওয়া, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে অযোগ্য গাড়ি ও অদক্ষ চালকের লাইসেন্সপ্রাপ্তি, সড়কে বিভিন্ন গতির গাড়ি/বাহন যুগপৎ চলাচল, দুর্ঘটনা বা

অনিয়মের ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যুগোপযোগী আইন না থাকা, বিদ্যমান আইনে প্রতিকার-প্রতিবিধান-ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না থাকা,

স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে নিরাপদ সড়কের চাহিদাকে সমন্বয় করতে না পারা ইত্যাদি।

 

২) কারিগরি ত্রুটি :

এর ভিতরে রয়েছে সড়ক পরিকল্পনা ও নির্মাণে সমস্যা, সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ ব্ল্যাকস্পট বা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক থাকা, রোড সিগন্যাল-ডিভাইডার-স্পিডব্রেকার-অ্যাকসেস রোডের সমস্যা।

 

৩)মানবীয় দুর্বলতা :

বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকের ওপর শারীরিক-মানসিক-আর্থিক চাপ, নিরাপদ সড়ক সম্পর্কে সচেতনতার অভাব,

পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল ও আচরণ, সড়কের পাশে দোকান-বাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালানো ইত্যাদি।

দুর্ঘটনা রোধে করণীয় কী সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব অমূল্য জীবনের হানি হয়, তা কোনো দিন ফিরে পাওয়ার নয়।

 

যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া দরকার তা হলো :
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান রাখা; কারণ দোষী চালকদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ থাকলে চালকরা সাবধানে গাড়ি চালাতে বাধ্য।

সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মামলা দায়েরের বিধান রাখতে হবে;

তা না হলে চালকরা সচেতন হবেন না এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

বিআরটিএ’র একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে অবৈধ লাইসেন্স দেন, এটি বন্ধ করতে হবে।

১৯৮৩ সালের পুরনো মোটরযান আইনকে আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হবে। দোষী চালকদের

বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও শ্রমিকনেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে তাদের ছাড়িয়ে আনতে পরিবহন সেক্টর একরকমের জিম্মি করে রাখা হয়।

এ জিম্মিদশা থেকে পরিবহন খাতকে মুক্ত করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

পুলিশের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে:

 

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক সময় উদাসীন হতে দেখা যায়; তাদের আরও ‘অ্যাকটিভ’ করতে হবে।

রোড অ্যাক্সিডেন্ট কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং বিআরটিএ’র প্রতিরোধ সেলগুলোকে কার্যকর করতে হবে।

 

অন্যান্য

 

ক) সারা দেশের মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক বা কেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করে তা শেষ করতে হবে।

কারণ, যত দেরিতে এই বাঁকের কাজ শেষ হবে মৃত্যুর মিছিল ততই লম্বা হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। প্রয়োজনে বাঁকগুলো তুলে দিতে হবে।

খ)সড়ক-মহাসড়কে নকশাসংক্রান্ত ত্রুটি দ্রুত সারাতে হবে।

গ)সারা দেশে গাড়ির ড্রাইভারদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঘ)ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কেউ এটি চালালে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তত্ক্ষণাৎ জরিমানা ও শাস্তি প্রদান করতে হবে।

ঙ)সড়কের পাশে কিংবা সড়কের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার, দোকানপাট, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের সাইনবোর্ডসর্বস্ব অফিস তুলে দিতে হবে।

চ)ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

ছ)পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার রোধে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জ)নিষিদ্ধের পরও মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও নসিমন-করিমনের মতো বিপজ্জনক যানবাহন এখনো চলছে; সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এ ধরনের যানবাহন বন্ধ করা খুব জরুরি।

সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে ভ্রাম্যমাণ পুলিশের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের প্রো-অ্যাকটিভ করতে হবে।

ঝ)বিআরটিএ’র জনবল বাড়াতে হবে, প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে হবে।

ঞ)পুরনো, লক্কড়-ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নিতে হবে। ফিটনেস ছাড়া কোনো গাড়ি পাওয়া গেলে জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ট)ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতে সড়কে প্রয়োজনমতো ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ বা ‘গণপরিবহন’ নামাতে হবে, প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে,

প্রয়োজনে প্রাইভেট কারে গ্যাস-সুবিধা বাতিল করতে হবে।

ঠ)সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কগুলোয় অত্যন্ত ধীরগতিতে ‘চার লেনে’র কাজ চলছে, এতে বাড়ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনা; তাই দ্রুতগতিতে চার লেনের কাজ শেষ করতে হবে।

 

প্রতিদিনই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা

 

মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে হচ্ছে দীর্ঘতর। বহু মানুষ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে চিরদিনের জন্য ঘরে বসে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

বাংলাদেশে বোধ করি এমন কোনো ঘর বা ফ্যামিলি পাওয়া যাবে না, যেখানে কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাননি অথবা আহত হননি।

এখনই এর রাশ টেনে ধরতে হবে, থামাতে হবে শবযাত্রার মিছিল; নিতে হবে দ্রুত রাজনৈতিক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ।

তবেই হয়তো ঈদ, কোরবানি, পহেলা বৈশাখ, বিজু, সাংগ্রাই, পূজা-পার্বণের মতো এ দেশের চিরন্তন ও

শাশ্বত উৎসবে নাড়ির টানে যাত্রা আর ফিরতিকালে কেউ ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়বে না, বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার সময় লাশ হয়ে ফিরবে না!

দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসুক, প্রতিটি উৎসব হোক উৎকণ্ঠাহীন, নিরাপদ, বর্ণিল, আনন্দময় ও হৃদয় নিংড়ানো।

দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি। এ তো সবার জানা যে, চালক-মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার লোভ বেপরোয়াভাবে যান চলাচলের আদি উৎস।

আমাদের দেশে সড়কের যে সক্ষমতা তাতে ৬০-৭০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলার সুযোগ নেই; কিন্তু চালকরা ১০০-১২০ পর্যন্ত গতিতে যাত্রীবাহী বাস চালাচ্ছেন।

এটা ধরার যন্ত্র নেই, দোষী ব্যক্তির শাস্তি নেই। (পূর্বোক্ত)। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় কোনো শাসন নেই, সুশাসন তো দূর অস্ত। কারণ খুঁজতে যাবেন না প্লিজ।

কারণ সবাই জানে, দরকার করণীয়।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত বেশি— প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে ৮৫ দশমিক ৫। পশ্চিমা দেশে এ হার মাত্র ৩।

তার মানে সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অদৃষ্ট নয়, ভাগ্যের লিখন নয়— চাইলে, উদ্যোগ নিলে, সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।

সিঙ্গাপুরে সড়ক দুর্ঘটনার হার খুবই কম। তাদের লক্ষ্য এ হার শূন্যে নামিয়ে আনা, অর্থাৎ বছরে একটিও দুর্ঘটনা না ঘটানো এবং তারা মনে করে এটি করা সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনা কোনো কপালের লিখন নয়, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করলে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা যায়।

 

কিন্তু আমরা কি তা করছি?

পাঠক ভাবুন, সিঙ্গাপুরের টার্গেট সড়কে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা আর আমাদের টার্গেট সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খোঁজা।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক পুলিশ— সবাই ধরে নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা মানুষের নিত্যদিনের নিয়তি, প্রাণহানি আর অঙ্গহানি যেন অপ্রতিকার্য এক সমস্যা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ২০-২১ হাজার মানুষ মারা যায়।

আগের দিনে কলেরা, টাইফয়েড আর ম্যালেরিয়ায় প্রতিদিন ডজন ডজন মানুষ মারা যেত, ওইসব মৃত্যুকে তখন চিহ্নিত করা হতো ‘মহামারী’ হিসেবে;

তবে কি আমরা একে নয়া মহামারী বলব? বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি জিডিপির ১.৬%।

সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব দেশ সাফল্য দেখিয়েছে তার মূলে রয়েছে এ-সংক্রান্ত আইন জোরদার ও বাস্তবায়ন করা, সড়ক ও যানবাহন আরও নিরাপদ করা।

দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় আফ্রিকায় আর সবচেয়ে কম ইউরোপে।

বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয় তার ৯০% ঘটে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে।

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহামারী রূপ নিয়েছে, এটি যেমন সত্য, বিপরীতে চেষ্টা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনাকে যে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তাও সমান সত্য।

গবেষণা বলছে বিশ্বের ৮৮টি দেশ দুর্ঘটনার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং ৮৭টি দেশে তা বেড়েছে।

সড়ক পরিবহন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান খাত;

কিন্তু সড়ক পরিবহন খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সময়োপযোগী ও কার্যকর বিধি-বিধান ও উদ্যোগ গ্রহণ করার দরকার ছিল বাংলাদেশে

সেই সক্ষমতায় বিরাট ঘাটতি রয়েছে এবং এই সামর্থ্যের অভাবই এ খাতের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়, সড়ক পরিবহন নিয়ে নতুন পলিসি, আইন, বিধি-বিধান প্রণীত হয় ঠিকই

কিন্তু প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবহন যাত্রীদের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না, যাত্রীদের সেবার মানোন্নয়নের বিষয়টি এবং তাদের কণ্ঠস্বর সব সময়ই উপেক্ষিত রয়ে যায়।

 

আসলেই কি মুসলিম নারীরা সম্পত্তিতে পুরুষের চেয়ে কম পেয়ে থাকে?

স্বাভাবিক ভাবে আমরা জানি ইসলাম ধর্মে সম্পত্তিতে পুত্র সন্তান যা পায় কন্যা সন্তান তার অর্ধেক ভাগ পায়। হাঁ, কিন্তু এই নিয়ম কখন প্রযোজ্য?

 

আমাদের দেশে অনেকে ‘নারীরা মুসলিম আইনে সম্পত্তিতে পুরুষের চেয়ে কেন কম পেয়ে থাকে’ এই প্রশ্ন করে থাকেন।

কিন্তু মুসলিম আইনের সব দিক পর্যালোচনা করে দেখা যাবে, এই আইনে সম্পত্তিতে পুরুষ নয় বরং নারীরাই তুলনামূলক ভাবে বেশি সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকে।

সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই নিয়ম হল যখন তাঁরা তাঁদের বাবার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে সেই ক্ষেত্রে।

কিন্তু বাবা থেকে সম্পত্তি পাওয়া ছাড়াও পুত্র সন্তানের পাশাপাশি কন্যারা আরও বিভিন্ন ভাবে সম্পত্তি পেয়ে থাকে।

যা হিসেব করলে দেখা যাবে কন্যা সন্তানের সম্পত্তির পরিমাণ পুত্র সন্তানের সম্পত্তির চেয়ে কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি হয়।

পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১১ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “আল্লাহ তায়ালা (তোমাদের উত্তরাধিকারে) সন্তানদের সম্পর্কে (এ মর্মে) তোমাদের জন্যে বিধান জারি করছেন যে,

এক ছেলের অংশ হবে দুই কন্যা সন্তানের মতো, কিন্তু (উত্তরাধিকারী) কন্যারা যদি দু’য়ের বেশি হয় তাহলে তাদের জন্যে (থাকবে) রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ,

আর (সে) কন্যা সন্তান যদি একজন হয়, তাহলে তার (অংশ) হবে (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) অর্ধেক, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্যে থাকবে

(সে সম্পদের) ছয় ভাগের এক ভাগ, (অপর দিকে) মৃত ব্যক্তির যদি কোন সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই যদি হয় (তার একমাত্র) উত্তরাধিকারী,

তাহলে তার মায়ের (অংশ) হবে ছয় ভাগের এক ভাগ, (মৃত্যুর) আগে সে যে ওসিয়ত করে গেছে এবং তার (রেখে যাওয়া) ঋণ আদায় করে দেয়ার পরই (কিন্তু এসব ভাগ-বাটোয়ারা করতে হবে),

তোমরা জানো না তোমাদের পিতা-মাতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে কে তোমাদের জন্যে উপকারের দিক থেকে বেশী নিকটবর্তী, (অতএব) এ হচ্ছে আল্লাহর বিধান,

অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সকল কিছু সম্পর্কে ওয়াকেফহাল এবং তিনিই হচ্ছেন বিজ্ঞ, পরম কুশলী।”

 

 

প্রথমত দেনমোহরের ক্ষেত্রে নারীঃ 

একজন মুসলিম নারী বিয়ে করলে সে তাঁর স্বামী থেকে দেনমোহর পেয়ে থাকে। যা স্বামীকে অবশ্যই বিয়ের আগে-পরে মুসলিম আইন অনুযায়ী দিয়ে দিতে হয়।

আর মুসলিম বিয়েতে দেনমোহরের হার প্রায় সময় অনেক বেশি হয়ে থাকে যাতে স্বামী সহজে অকারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে না পারে।

এমন কি স্বামীর মৃত্যু হলেও স্ত্রীর প্রাপ্ত দেনমোহর মাফ হয়না। স্ত্রী তা আইন অনুযায়ী আদায় করে নিতে পারে।

 

 

দ্বিতীয়ত ভরণপোষণের ক্ষেত্রেঃ

ইসলাম ধর্মে তথা মুসলিম আইন অনুযায়ী একজন পুত্র সন্তান উপার্জনক্ষম হলে তাঁর উপর সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব এসে যায়।

আর সে যখন স্বামী তখন তাঁকে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হয়, সে যখন বাবা তখন তাঁকে তাঁর ছেলে মেয়েদের ভরণপোষণ দিতে হয় ও মেয়েদের বিয়ে ব্যবস্থা করতে হয়,

সে যখন ভাই তখন ছোট ভাই বোনদের ভরণপোষণ ও অবিবাহিত বোনদের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও থাকে তাঁর উপর।

সন্তান হিসেবে নিজ মা বাবার দায়দায়িত্বও পুত্র সন্তানকে গ্রহণ করতে হয়।

এই বিষয়ে আমাদের দেশে পিতামাতার ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা আইনও রয়েছে।

ইসলাম ধর্মে এই সকল দায়দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু মাত্র তা পুরুষের উপরই অর্পণ করা হয়েছে।

আর পুত্র সন্তানও ওই সকল দায়দায়িত্ব পালন করতে আইনগত ভাবে বাধ্য।

আর কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে উল্লিখিত দায়দায়িত্বগুলো পালন করা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার। তাই সে এই সকল দায়দায়িত্ব পালন করতে না চায়লে তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।

 

 

তৃতীয়ত উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রেঃ

একজন পুরুষ স্বাভাবিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পিতা-মাতার সম্পত্তি থেকেই অংশ পায়।

একজন নারী সন্তান হিসেবে পিতা-মাতার কাছ থেকে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর কাছ থেকে, মা হিসেবে সন্তানের কাছ থেকে সম্পত্তির অংশ পায়।

সবগুলো অংশ যোগ করলে এবং উল্লেখিত সব দিক দিয়ে বিবেচনা করলে নারীর অংশের সম্পত্তি, পিতা-মাতার কাছ থেকে পাওয়া পুরুষের অংশের সম্পত্তির চেয়ে বেশিই হওয়ার কথা।

 

মোটকথা, পুরুষ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি একটু বেশি পাওয়ার কারনে পুরুষদের সাধারণত নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে হয়ঃ

১) পরিবারের ছোট ভাই বোন থাকলে তাদের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে হয় বড় ভাইকে।

২) বাড়িতে কোন আত্নীয় (বোন, বোনের জামাই) এলে সকল খরচ বড় ভাই বহন করে থাকে।

৩) স্ত্রীর ভরণপোষণ থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় খরচ স্বামীর। কিন্তু এখানেও স্ত্রীর কোন বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নেই।

৪) বাবা মায়ের দেখাশুনা ও চিকিৎসা

৫) বোনের বিয়ের যাবতীয় খরচ ইত্যাদি।

 

তাই আগে মুসলিম আইন ও ইসলাম ধর্মে নারীদের সম্পত্তির উপর যে অধিকার দেওয়া হয়েছে

সেই অধিকারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তাবায়ন করা গেলে দেশে মুসলিম নারীদের আর্থিক কষ্ট অনেক লাঘব হয়ে যাবে।

সার্বিক দিক বিবেচনা করলে মুসলিম নারীরা পুরুষের চেয়ে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই।

কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ মুসলিম নারী আইন অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য সম্পত্তিটুকুই পায় না।

যার কারণে স্বামী মারা গেলে বা বিবাহ বিচ্ছেদ হলে তাঁদেরকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয় ।

যাহোক কারা বেশি পাচ্ছে, কারা কম পাচ্ছে এই প্রশ্নে না যেয়ে বরং আমাদের এই মুহূর্তে যেটা দরকার

তা হল মুসলিম আইনে বর্তমানে নারীদের সম্পত্তিতে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা পুরোপুরি ভাবে কার্যকর করা।

কারণ এখনও অধিকাংশ গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরেও নারীদের তাঁদের পিতৃ সম্পত্তি থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে নানা রকম ছলচাতুরী দিয়ে।

 

কখনো বা সরাসরি বলে দেওয়া হচ্ছে যে পরিবারের কোন নারী সদস্যকে কোন প্রকার সম্পত্তি দেওয়া হবে না।

তাই আমাদের আগে মুসলিম নারীর সম্পত্তিতে প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে

 

আইন বিভাগ ও তার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প

ছাত্রজীবনে ভাবতাম জীবনে একদিনের জন্য হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করবো, দেশবরেণ্য সম্মানীত পন্ডিত মন্ডলীর সহিত উঠাবসা করব, তাদের পদাংক অনুসরন করবো।

২০০২(ডিসেম্বর)সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরনের পর আমার কল্পনার জগতের সাথে বাস্তবের বিস্তর পার্থক্য দেখতে পেলাম।

সত্যিকারের পান্ডিত্য অর্জন করা কিংবা আদর্শস্থানীয় অধ্যাপক হওয়ার জন্য যেই ধরনের নিবেদন, পরিশ্রম, বিনিয়োগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয় তার তুলনায় ছাত্রজীবনের অধ্যাবসায় একদম নস্যি।

জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান সৃজন এবং তা বিতরনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলো আদর্শ স্থান।

আমি যখন মেধাবী, চৌকষ, সৃজনশীল ও দুর্দান্ত ছেলেমেয়েদের পাঠ দান করার জন্য শ্রেণীকক্ষে যাই তখন নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশনার পাঠ চুকিয়ে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সফলভাবে পেশাগত জীবনে উত্তরণ হতে দেখে নিজেদের আনন্দকে আর লুকিয়ে রাখতে পারি না।

অনেকটা ঘোষণার মত করেই মানুষজনকে বলি অমুক জেলায় আমাদের এতজন ছাত্র-ছাত্রী বিচারক পদে কাজ করছে

কিংবা ঐ কোম্পানীর আইন কর্মকর্তা পদে আমাদেরই একজন ছাত্র কর্মরত আছে।

বিশ্ব মানদন্ডের সাথে নিজেদের তুলনার মহাধৃষ্টতা না দেখিয়েই বলতে চাই আমাদের বিভাগে একাডেমিক কার্যক্রমের নূন্যতম বাধ্যবাধকতা মেনে চলা হয়।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিগত ২২ বছরে আইন বিভাগের একাডেমিক এনং নন-একাডেমিক কার্যক্রমের সার্বিক চিত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগের তুলনায় ঈর্ষনীয়।

সংখ্যাতত্বের দিক থেকে দেশের BAR এবং BENCH গুলোতে আমাদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য।

সামরিক, বেসামরিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইন শাখায় আমাদের গ্রাজুয়েটরা যোগ্যতার সহিত কাজ করছেন।

বিদেশের মাটিতে আমাদের Alumni গন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আছেন, অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে কর্মসংস্থান লাভ করেছেন।

দেশে ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেকেই যোগ্যতার সহিত অধ্যাপনা করছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিবার এর একজন সদস্য হিসেবে এ সকল অর্জন ও প্রাপ্তি আমাকে আপ্লুত করে, শিহরিত করে এবং অনুপ্রেরণা যোগায়।

আমাদের অনুষদের বরিষ্ঠ শিক্ষক আইন কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন, আমাদের একজন সম্মানীত শিক্ষক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সদস্য হয়েছেন,

আমাদের অধ্যাপকগণ নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি করেছেন এবং করছেন।

আমাদেরই অধ্যাপকগণ আন্তর্জাতিক সংস্থায় কনসাল্টেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের কারো কারো বই নামকরা প্রকাশনা সংস্থা হতে প্রকাশিত হয়েছে।

এসবই আমাদের অর্জন-আইন পরিবারের গর্ব। আমরা চাইলে এসব অর্জনকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারি, আরো অনেক দূর যাওয়ার সক্ষমতা আছে আমাদের।

স্বপ্ন দেখতে পয়সা লাগেনা, কাউকে জবাবদিহি করতে হয়না। আমি আমার স্বপ্ন পাখির ডানা পুরপুরি মেলে দিতে চাই।

আমি মন খুলে আমার ভাবনাগুলো প্রকাশ করতে চাই, আগামী ত্রিশ বছরের (২০৪৪ খৃষ্টাব্দ ) মধ্যে

আমাদের আইন পরিবার কি কি অর্জন করতে পারে আমি তার একটি উইশ লিস্ট (Wish List) বর্ণনা করতে চাই।

আমি স্বপ্ন দেখি আমাদের গ্রাজুয়েটরা WTO, ILO, WIPO, European Union, জাতিসংঘসহ

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে Intern হিসেবে সরারি রিক্রুট হচ্ছে।

ভারতের বিখ্যাত বিজনেস স্কুল Indian Institute of Management (IIM) এবং Delhi School of Business (DSB) -এ প্রতি বছর বিশ্বের খ্যাতনামা কোম্পানী ও প্রতিষ্ঠানসমুহ গ্রাজুয়েট সার্চ করতে যায়।

২০০৯ সালে এই দুটো প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০% গ্রাজুয়েট রিক্রুট হয়েছে এবং তাদের গড় বাৎসরিক বেতন ছিল ৮০ লক্ষ রুপী।

আমি পরিষ্কার দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো

এবং নামকরা আইনী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব উদ্যোগ ও ব্যাবস্থাপনায় আমাদের আইন অনুষদের ক্যাম্পাসে চাকরি মেলার আয়োজন করছে আর আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উঁচু বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে।

পাশ করে আমাদের কোনো ছাত্র-ছাত্রী একদিনের জন্যও বেকার থাকবে না। আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এবং আমার বিশ্বাসের যথেষ্ঠ ভিত্তি আছে।

world ranking-এ ৫০ এর ভিতরে আছে এমন ল’ স্কুলগুলোতে আমাদের সম্মানীত ফ্যাকাল্টিগণ ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে নিয়মিত আসা-যাওয়া করবেন।

আমাদের একাডেমিক জার্নালে আ্ইনের জগতে সর্বশেষ ও সর্বসাম্প্রতিক findings নিয়ে সারা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় Legal scholars গণ তাদের মহামূল্যবান গবেষণাকর্ম প্রকাশ করবেন।

চ.বি. Law School হবে দক্ষিন এশিয়ার নেতৃস্থানীয় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

Bangalore National Law School, Delhi Law School, Kathmandu Law School, Indian Institute of Management, Lahore School of Management Science (LAMS) –

এ সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের আইন অনুষদের নাম ও উচ্চারিত হবে।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে যে সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি, ট্রিটি, কনভেনশন বা চার্টার গৃহীত হয় এসবের ড্রাফটিং প্রক্রিয়াতে আমরাও অংশগ্রহন করব।

আমি স্বপ্ন দেখি আন্তর্জাতিক বিরোধ সমূহের নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশে আমরাও অবদান রাখছি।

Hague International Law Academy, Netherland কিংবা ASLO PEACE CENTRE, NORWAY এর মতো অনুরূপ বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান আমাদের এখানে গড়ে উঠবে।

যে যাই মনে করুক বা বলুক, আমি মনের গহীন কোনে এই স্বপ্ন প্রতিনিয়ত দেখি। আমার একান্ত বিশ্বাস, আমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে-প্রত্যাশিত কিংবা অপ্রত্যাশিত পন্থায়।

“মানুষ যা ভাবতে পারে, যা বিশ্বাস করতে পারে, তা অর্জন করতে পারে”। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের আইন পরিবারের এইসব সম্ভাবনা ও তা অর্জনের সামর্থ্য আছে।

 

সূত্রঃ বাংলানিউজ২৪